গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট; জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন, শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে ২৯৩
নিজস্ব প্রতিবেদক: চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২.১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় পাসের হার যেমন কমেছে, তেমনি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। সে বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ অর্জনকারীর সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
শনিবার (১ নভেম্বর) সকাল ১১টায় সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন।
উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন এবং ছাত্রী ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। অর্থাৎ, ছেলেদের তুলনায় ৬৬ হাজার ৩৭১ জন বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলাফলে আবারও মেয়েদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছর মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ। এসব বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর ফলাফলেও ছাত্রীদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। উত্তীর্ণদের মধ্যে ছাত্র ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন এবং ছাত্রী ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৬০ জন। অর্থাৎ, ছাত্রদের তুলনায় ৮৫ হাজার ৬৭১ জন বেশি ছাত্রী পাস করেছে।
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি। এ বছর সারা দেশে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩৯টি। অন্যদিকে, একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি—এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি।
গত বছরের তুলনায় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১টি বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পাঠদান কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে এ পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ বছর মোট পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল ২ হাজার ৭৬০টি এবং পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ হাজার ৩৯০টি। গত বছরের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৮টি বাড়লেও পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা কমেছে ৪০টি।
বিদেশের কেন্দ্রে পাসের হার ৯০.৮৭ শতাংশ
দেশের বাইরে আটটি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় মোট ২৩০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২০৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এসব কেন্দ্রে পাসের হার ৯০.৮৭ শতাংশ, যা দেশের সামগ্রিক পাসের হারের তুলনায় অনেক বেশি।
সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পরীক্ষার ফলের পরিসংখ্যান নয়, কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে পাঠদানের মানোন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং কার্যকর তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
কারণ, এইচএসসি কেবল একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়; উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পথে শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। তাই এবারের ফলাফলের অবনতিকে শুধু পরীক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।